কার টুঁটি চেপে ধরছেন, সাংবাদিকের না সাংবাদিকতার?

১৯৯৪ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতায় ফেলোশিপ করে দেশে ফেরার পর আমাকে দায়িত্ব দেয়া হলো কূটনৈতিক বিট করার জন্য। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে পাকিস্তান ও ভারতের নির্বাচন কভার করে এসেছি। সম্পাদক মতি ভাই বললেন, তুমি কিছুদিন পলিটিক্যাল রিপোর্ট বাদ দিয়ে কূটনৈতিক রিপোর্ট করো। সব জাঁদরেল রিপোর্টার তখন কূটনীতিক বিট করছেন। জগলুল আহমেদ চৌধুরী, মতিউর রহমান চৌধুরী, আলমগীর হোসেন, আমীর খসরু ও আমান উদ দৌলারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন সেগুনবাগিচা পররাষ্ট্র ভবন। প্রথম দিনেই এই ভবনে ঢুকতে গিয়ে হোঁচট খেলাম। রিসিপশনে আমাকে বলা হলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঢুকতে হলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের পিআইডির অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড দিয়ে হবে না। গোয়েন্দা সংস্থার আলাদা ক্লিয়ারেন্স লাগবে।

প্রতিদিন যোগাযোগ করি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে, সেই ক্লিয়ারেন্স আর আসে না। মন্ত্রণালয়ের এক শুভানুধ্যায়ী আমাকে পরে জানালেন, আপনার নামে নেগেটিভ রিপোর্ট এসেছে। আপনি যেহেতু হিন্দু ধর্মাবলম্বী, তাই পররাষ্ট্র বিষয়ক স্পর্শকাতর ডকুমেন্ট প্রতিবেশী দেশে পাচার করে দিতে পারেন। আপনাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঢুকতে ক্লিয়ারেন্স না দেয়ার পক্ষে মতামত দিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। কর্নেল (অব) আ স ম মোস্তাফিজুর রহমান তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। একদিন সংসদে রিপোর্ট করতে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা হলো সংসদ ভবনের লবিতে। তার সঙ্গে আগে থেকেই ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। সমস্যাটা তাকে খুলে বললাম। তিনি বললেন, তুমি কালকে আমার সঙ্গে আমার ইস্কাটনের বাসায় দেখা করো, দেখি কি করা যায়। এক বিকালে তার সঙ্গে দেখা করলাম পররাষ্ট্র ভবনে।

তিনি বললেন, আমি এসবির সঙ্গে কথা বলেছি, ক্লিয়ারেন্স পেয়ে যাবে। এর মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় না গিয়েও বেশকিছু রিপোর্ট করলাম। বিশেষ করে আটকে পড়া পাকিস্তানি, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে। আমার অগ্রজ কূটনৈতিক রিপোর্টাররাও আমাকে অনেক সহযোগিতা করতেন সে সময়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি স্পর্শকাতর জায়গা কিন্তু এর মধ্যেই ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করে ফেললাম অনেকের সঙ্গে, যাকে আমরা সাংবাদিকতার ভাষায় বলি সোর্স। রিপোর্টিংয়ের অন্যতম প্রাণশক্তি এই সোর্স। যার সোর্স যত ভালো, তিনি তত ভালো রিপোর্টার। বহু কাগজ, গুরুত্বপূর্ণ নথি নির্দ্বিধায় নিয়ে এসেছি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। কখনো ফটোকপি করে, কখনো হাতে লিখে। কারণ তখন মোবাইলের যুগ ছিল না। ছবি নেয়ার সুযোগও ছিল না।

একদিন আমার সম্পাদক মতিউর রহমান (যিনি এখন প্রথম আলোর সম্পাদক) আমাকে তার রুমে ডেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুরো একটি ফাইল আমার হাতে দিয়ে দিলেন। ফাইলটি হাতে নিয়ে আমি চমকে গেলাম। এটি দক্ষিণ এশিয়া ডেস্কের একটি ফাইল এবং উপরে ‘হাইলি কনফিডেনশিয়াল’ লেখা। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানপত্র উল্লেখ করা ছিল এই ফাইলে। ফাইলের উপরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা হিসেবে আবুল হাসান মাহমুদ আলীর নাম উল্লেখ করা আছে। তিনি সে সময় ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া ডেস্কের পরিচালক। পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুরো একটি ফাইল কি করে সাংবাদিকের হাতে এলো, তা ভেবে আমার মাথা ঘুরছিল তখন। মতি ভাই আমাকে বললেন, অনেকগুলো রিপোর্টের ক্লু পাবে এখানে। ফাইলটি তোমার কাছে রাখো।

আমরা যখন নব্বইয়ের গণআন্দোলনের পর আজকের কাগজে রিপোর্টিং শুরু করি, মতি ভাই তখন আজকের কাগজে বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে রিপোর্ট করতেন পররাষ্ট্রের নানা বিষয়ে। তার অনেক দুর্দান্ত রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল সে সময়। কূটনৈতিক অঙ্গনেও মতি ভাইয়ের যোগাযোগ ছিল ঈর্ষণীয়। হয়তো সেই সুবাদেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুরো ফাইল তার কাছে। ফাইলটি পড়তে পড়তে উত্তেজনায় কাঁপছিলাম। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক স্পর্শকাতর বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত ছিল সেই ফাইলে। কয়েক দিন পরেই নওয়াজ শরিফ সরকারের সঙ্গে খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বিএনপি সরকারের একটি চুক্তি হয়েছিল আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফেরত নেয়ার ব্যাপারে। দেখলাম তার নথিও সেই ফাইলে আছে। একটি প্রতীকী প্রত্যাবাসন হিসেবে ৮৬ জন আটকে পড়া পাকিস্তানি ফেরত গিয়েছিল পাকিস্তানের মুলতান শহরে। তারা যে আবার বাংলাদেশে ফেরত চলে আসছে এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি যে ব্যর্থ হয়েছে, সেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেলাম এই ফাইলে। আটকে পড়া পাকিস্তানিরা যেতে চায় করাচিতে। কিন্তু করাচির সিন্ধ সরকারের বিরোধিতার কারণে তাদের করাচি না নিয়ে পাঞ্জাবের মুলতানে নেয়া হলো, যেটি তাদের পছন্দের জায়গা ছিল না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত ছিল, পুরো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি ছিল নওয়াজ সরকারের একটি লোক দেখানো কর্মসূচি। এ কর্মসূচিতে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের আর ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি এবং যারা মুলতান গিয়েছিল, তারা বিভিন্ন পথ দিয়ে আবার বাংলাদেশে ফিরে এসেছে।

এই পুরো ঘটনাটি বলার কারণ একটাই। কাগজ চুরি, ফাইল চুরি- সাংবাদিকদের জন্য একটা নিয়মিত ঘটনা। এই কাগজটি আমি ব্যক্তিগত কোনো কারণে চুরি করছি না। এই তথ্যটি চুরি করছি সাংবাদিকতার স্বার্থে। এই কাজটি করতে গিয়ে আমার ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জনগণের তথ্য জানার স্বার্থে গণমাধ্যম এ কাজটি করে থাকে। যুগ যুগ ধরে সাংবাদিকতা এভাবেই এগিয়েছে। পৃথিবীর বহু খ্যাতনামা রিপোর্ট হয়েছে এভাবেই। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি নামে ওয়াশিংটন পোস্টে ছাপা হওয়া যে রিপোর্টের প্রেক্ষিতে ১৯৭৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল, সেই প্রখ্যাত সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড তথ্য চুরি করেই রিপোর্ট করেছিলেন। বিশ্বখ্যাত বহু সাংবাদিক পুলিৎজার পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন এভাবেই সাংবাদিকতা করে। ভারতের তেহেলকা ডটকম নামে একটি প্রখ্যাত অনলাইন এ ধরনের বহু অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রচার করেছে। যদিও সাহসী সাংবাদিকতা করে প্রাতিষ্ঠানিক চাপে এ প্রতিষ্ঠানটি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি।

ভারতের বিখ্যাত বোফর্স কেলেঙ্কারিতে দ্য হিন্দু পত্রিকার রিপোর্টার চিত্রা সুব্রানিয়ামকে সাড়ে তিনশ পৃষ্ঠার দলিল সরবরাহ করেছিলেন সুইডেনের একজন পুলিশ কর্মকর্তা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের স্পর্শকাতর দলিল গণমাধ্যমকে সরবরাহ করা যায় কিনা- প্রশ্ন উত্থাপিত হলে সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট গণমাধ্যমের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন।

সম্প্রতি পশ্চিম বাংলায় দুজন মন্ত্রীসহ চারজন রাজনৈতিক নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন একটি অনলাইনের স্টিং অপারেশনে। নারদ ডটকম নামে ওই অনলাইনের স্টিং অপারেশনে দেখানো হয়েছে পশ্চিম বাংলার তৃণমূল কংগ্রেসের মন্ত্রী ও এমপিরা ঘুষ নেন। এ ধরনের অপারেশনকে অনেকে নৈতিক-অনৈতিক আখ্যা দিতে পারেন কিন্তু সাংবাদিকতার এটাও একটা স্বীকৃত পথ।

সচিবালয় থেকে কাগজ নিয়ে আসার জন্য আমাদের একজন সহকর্মীর সুনাম ছিল। তার নাম সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম। বর্তমানে সময়ের আলোতে কাজ করছেন। তাকে আমরা ঠাট্টা করে ডাকতাম ‘চোথা সাংবাদিক’। মন্ত্রণালয়ে চিঠিপত্র বা সিদ্ধান্তের কাগজ তৈরি হওয়ার আগেই তার হাতে চলে আসত। দুর্দান্ত যোগাযোগ ছিল তার। কাশেম হুমায়ূন আরো এক ধাপ এগিয়ে। সব আমলাই বলতে গেলে তার বন্ধু। সচিবালয়ে না গেলেও খবর পৌঁছে যেত তার কাছে। দীর্ঘ সময় ধরে দেখেছি, কেবিনেট মিটিংয়ে কী আলোচনা হবে- এই গোপন তথ্যটি সবার আগেই চলে যায় সাংবাদিকদের কাছে। সচিবালয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখলাম অনেক মন্ত্রী আমাদের সোর্স। মিটিংয়ের ভেতরকার নানা খবর কিংবা কী আলোচনা হবে, তার নানা বিষয় অনেক মন্ত্রীই আমাদের সরবরাহ করতেন। এর জন্য ১৯২৩ সালের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট কোনো বাধা হয়নি। কেবিনেট মিটিংয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকরা খবর আগেই চাউর হয়ে যাওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করলেও কোনো মন্ত্রীকে এর জন্য জবাবদিহি করতে হয়নি, কোনো সাংবাদিককেও এর জন্য বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়নি। আমাদের কেউ কোনো দিন টুঁটি চেপে ধরেননি বা ৬ ঘণ্টা কক্ষে নিয়ে আটকেও রাখেননি। তখন সরকার অনেক বেশি সহনশীল ছিল, কর্মকর্তারা অনেক বেশি মিডিয়াবান্ধব ছিলেন। একথা বুঝতে হবে টুঁটি চেপে ধরে সাংবাদিকতা বন্ধ করা যায় না বরং তা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত বহন করে। গণতন্ত্রের বিকাশে মুক্ত গণমাধ্যম সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তাই সাংবাদিকের গলা টিপে ধরা মানে গণতন্ত্রের গলা টিপে ধরা। স্বাধীন বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে এ ধরনের পরিস্থিতি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।

আমাদের স্বাধীনতার মূল আকাঙ্খায় ছিল একটি গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, যার জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘসময় আন্দোলন-সংগ্রাম করে এই রাষ্ট্রটি উপহার দিয়েছেন। সারা জীবন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করা তার বাংলাদেশে আজ এ ধরনের পরিস্থিতি একেবারেই প্রত্যাশিত নয়।

অন্যদিকে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে নীতি-নৈতিকতার বিষয়টিকে উপেক্ষা করাও সঠিক না। ইদানীং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে। সাংবাদিকরা যে ধোয়া তুলসীপাতা, সেটাও বলব না। সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করে অনেকে অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন, এমন বহু উদাহরণ হয়তো আছে। কিন্তু তাকে প্রতিরোধ করার জন্য প্রচলিত পথেই যেতে হবে। প্রফেশনালিজম আনতে হবে পেশায়। সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায় আরো জোর দিতে হবে। সাংবাদিকরা সমাজের কোনো বিচ্ছিন্ন প্রাণী নয়। অবক্ষয় যদি লাগে, তার প্রভাব সর্বত্র পড়তে বাধ্য। সাংবাদিকতা বিত্তবৈভব বানানোর কোনো পেশা নয়। এটি সমাজের জন্য কল্যাণমূলক কাজ করার পেশা।

রোজিনা ইসলামকে টুঁটি চেপে ধরে ৬ ঘণ্টা আটকে রেখে ও মামলা দিয়ে জেলে পাঠিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি করা হলো, তাতে কেউই লাভবান হবে না। দেশে-বিদেশে বাংলাদেশ আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো গণতন্ত্রের ও অনিবার্য অনুষঙ্গ মুক্ত সাংবাদিকতার। এ চরম ক্ষতিটা কি অদক্ষতার না উদ্দেশ্যমূলক- তার তদন্ত হওয়াটা মনে হয় বেশি জরুরি।